দৈনিক নারায়ণগঞ্জ: সংবাদপত্র রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ আর সাংবাদিক জাতির বিবেক ও সমাজের আয়না। একটি রাষ্ট্রে যদি সংবাদপত্রের স্বাধীনতা না থাকে তাহলে ওই রাষ্ট্রে অন্ধকার নেমে আসে। সে দেশের গণতন্ত্র হয়ে পরে মূল্যহীন। আর তাই পেশাটিকে অনেক গুরুত্ব ও সম্মানের সহিত দেখা হয়। মূল্যবান এই পেশা বিতর্কিত হচ্ছে স্বঘোষিত ধান্দাবাজদের ‘সাংবাদিক’ হয়ে গড়ে ওঠাকে কেন্দ্র করে। পাড়া মহল্লায় যেকোন নামে অনলাইন খুলে কিংবা এক পাতার কিছু একটা ছাপিয়েই কিছু লোক স্বঘোষিত সাংবাদিক হয়ে পড়ছে। যেনতেন প্রকারে আন্ডারগ্রাউন্ড একটি পত্রিকা বের করে কিংবা অনলাইন পোর্টাল চালু করে চলছে ব্ল্যাকমেইলিং আর চাঁদাবাজির উৎসব।সর্বোপরি, ভুয়া সাংবাদিকে ছেয়ে গেছে পুরো নারায়ণগঞ্জ।
এসব কথিত সাংবাদিকদের দায় নিতে হচ্ছে প্রকৃত
সাংবাদিকদেরকে। নারায়ণগঞ্জে সাংবাদিক পরিচয়ের আড়ালে ভয়ঙ্কর অপরাধীর সংখ্যা বাড়ছে। এরা
নিজেদের অপরাধ আড়াল করতে কৌশল হিসেবে নামসর্বস্ব আবার কেউ ভূঁইফোড় অনলাইন পত্রিকার
আইডি কার্ড সংগ্রহ করে সাংবাদিক পরিচয়ে চালাচ্ছে অপকর্ম। আবার কারো রয়েছে সরকারি দলের
সহযোগী সংগঠনের পদবী। মোটরসাইকেলে প্রেস বা সাংবাদিক লিখে মাদকের ব্যবসাও চালিয়ে যাচ্ছে
অনেকে। গত মঙ্গলবার সিদ্ধিরগঞ্জ থেকে বহুমুখী সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্রের মূলহোতা প্রদীপ
চন্দ্র বর্মণকে এক সহযোগীসহ গ্রেপ্তার করেছে র্যাব। প্রদীপ চন্দ্র বর্মণ ওয়াকিটকি
সেট, মনোগ্রাম সম্বলিত জ্যাকেট ও হ্যান্ডকাফ দেখিয়ে নিজেকে একাধারে ‘সমাজের জন্য আন্তর্জাতিক
মানবাধিকার আইন প্রয়োগকারী সংস্থা’র চেয়ারম্যান,তালাশ
নিউজ টিভি-৭৯ ও দৈনিক সত্যের সংগ্রাম পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, প্রকাশক ও সম্পাদক
হিসেবে পরিচয় প্রদান করে থাকে এবং সে ভুয়া আইডি কার্ড তৈরি করে ট্রাফিক পুলিশ ও যুব
ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে চাকুরীর আশ্বাস দিয়ে এবং তার কথিত টিভি চ্যানেল ও ‘সমাজের জন্য আন্তর্জাতিক
মানবাধিকার আইন প্রয়োগকারী সংস্থার’ অন্যান্য সদস্যপদে
ও নিউজ চ্যানেলের জেলা প্রতিনিধি নিয়োগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি প্রদান করে সরল বিশ্বাসী
মানুষের কাছ থেকে চাকরি প্রদানের আশ্বাস দিয়ে পরিকল্পনা মাফিক বিপুল পরিমান টাকা হাতিয়ে
নিতো। তবে অধরা রয়ে গেছে তার সহযোগী প্রতারক রেহেনা ও জহির। গত ১২ মে সকালে ফতুল্লার
তল্লা এলাকা থেকে ১২০০ পিছ ইয়াবা ট্যাবলেটসহ সাংবাদিক পরিচয়দানকারী দুই মাদক ব্যবসায়ীকে
গ্রেফতার করেছে জেলা মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। গ্রেফতারকৃতরা হলেন শিবপুরের মো. মুসা
মিয়ার ছেলে ও পশ্চিম ইসদাইরের এ্যালবাম গার্মেন্টস সংলগ্ন মিজান ডাক্তার এর বাড়ীর ভাড়াটিয়া
সাইফুল ইসলাম সুমন ও মুন্সিগঞ্জের খলিল সিকদারের ছেলে ও পশ্চিম দেওভাগ বাশমুলি এলাকার
আনোয়ার গাজীর বাড়ির ভাড়াটিয়া ইমরান হোসেন। এ সময় তাদের নিকট থেকে চারটি মোবাইল ফোন
২৭’শ টাকা সহ ১২’শ পিছ ইয়াবা ট্যাবলেট
উদ্ধার করা হয়। গ্রেফতারকৃতরা দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসা করার পাশাপাশি প্রশাসনের নজর
এড়াতে নিজেদেরকে সাংবাদিক পরিচয় সহ বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে মাদক ব্যবসা করে আসছে।
গত ২৫ মে সিদ্ধিরগঞ্জে পাইকারি কসমেটিক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে প্রথম দফায় ৮৫ হাজার টাকা
নিয়ে দ্বিতীয়বার ৫০ হাজার টাকা চাঁদা আনতে গিয়ে আটক হন নারগিস আক্তার নামে এক কথিত
নারী সাংবাদিক। এসময় পালিয়ে যায় তার দুই সহযোগী। গত ১২ মে সকালে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিদর্শক মোশাররাফ হোসেন ফতুল্লার তল্লা এলাকা
থেকে চারটি মোবাইল ফোন ২৭০০ টাকা ১২০০ পিছ ইয়াবা ট্যাবলেটসহ সাংবাদিক পরিচয়দানকারী
সাইফুল ইসলাম সুমন তার সহযোগী ইমরান হোসেনকে গ্রেফতার করেছে জেলা মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর।
গ্রেফতারকৃতরা নিজেদেরকে বিভিন্ন পত্রিকা ও নিউজ র্পোটালের সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে আসতেন।
গত ২৪ জানুয়ারী এক নারীর অপত্তিকর ছবি ও মিথ্যা বানোয়াট খবর অনলাইন নিউজ পোটালে প্রকাশের
অভিযোগে রবিউল ইসলাম রবি নামে এক কথিত সাংবাদিকে সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকা থেকে গ্রেফতার করে
র্যব-১১। গত বছরের ৩০ জুন ভুয়া সাংবাদিক ও তিতাসের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে প্রতারণা
ও চাঁদাবাজির অভিযোগে পৃথক ঘটনায় প্রতারক চক্রের ৯ সদস্যকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এ সময়
পুলিশ তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন পত্রিকার ভুয়া পরিচয়পত্র, প্রতারণার কাজে ব্যবহৃত ভিডিও
ক্যামেরা ও একটি মাইক্রোবাস জব্দ কর হয়। গ্রেফতারকৃতরা হলেন- সেলিম নিজামী, মাসুদ মিয়া,
শফিকুল ইসলাম, ইউসুফ, রুহুল আমিন, বাবু সরদার, শরিফ, সাইফুল ইসলাম ও ফয়সাল। তারা রাজধানীর
ডেমরা থানার সারুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা সহ জেলার বিভিন্ন থানা এলাকার বাসিন্দা।
গত বছরের ৯ অক্টোবর সিদ্ধিরগঞ্জে সাংবাদিক পরিচয়ে ভিজিটিং কার্ড ও আইডি কার্ড করার
সময় স্থানীয় দোকানদারদের সহযোগিতায় নীরব হোসেন মিন্টুকে নামে ভুয়া সাংবাদিককে আটক করে
পুলিশ। চিটাগাং রোড হক সুপার মার্কেটের এম আর গ্রাফিক্স অ্যান্ড কম্পিউটার দোকান থেকে এই প্রতারককে আটক করা হয়। গত ২০ জুলাই চাষাড়ায় একটি
দোকানে অভিযান চালিয়ে বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষা বোর্ডের নামে জাল শিক্ষা
সনদ এবং ভুয়া জন্ম নিবন্ধন তৈরির অভিযোগে রাশেদ আহম্মেদ নামে এক প্রতারককে আটক করেছে
র্যাব। রাশেদ নিজেকে জয়যাত্রা টিভির সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন জনের সাথে
প্রতারণার পাশাপাশি দীর্ঘদিন যাবত তার দোকানে জাল সদন তৈরির কাজ করতো। ২৪ মাচ ২০১৯
আড়াইহাজারে সেলিম নামে আন্তজেলা ডাকাত দলের এক সদস্যকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এসময় সেলিমের
কাছ থেকে ‘সাপ্তাহিক আমার কণ্ঠ’নামে একটি পত্রিকার
আইডি কার্ড উদ্ধার করেছে পুলিশ। এর আগে একটি ডাকাতির মামলায় ডাকাত সন্দেহে কথিত আমার
কণ্ঠের সম্পাদক আলম খানকে পুলিশ গ্রেফতার করে। স্থানীয় গির্দা এলাকায় কাপড় ব্যবসাীয়
রউফ মিয়ার বাড়ির দ্বিতীয় তলা গ্রিল কেটে ডাকাতির ঘটনা ঘটে। ডাকাতরা স্বর্ণালঙ্কারসহ
ও নগদ অর্থসহ প্রায় ৭০ লাখ টাকার মালামাল লুট করে নেয়। পরে থানায় অজ্ঞাত ১০ থেকে ১২
ব্যাক্তিকে আসামি করে ডাকাতির একটি মামলা করা হয়। ঘটনাস্থলে ডাকাতদের ফেলে যাওয়া মোবাইল
সেটের সূত্র ধরে পুলিশ তাদের চিহ্নিত করতে সক্ষম হয়। ৭ মে ২০১৮ আড়াইহাজারে মোঃ ইউসুফ
নামে ভুয়া এক সাংবাদিককে ইয়াবাসহ গ্রেফতার করে।
ইয়াবা বিক্রির সময় গোপালদী পৌরসভার মোল্লার চর এলাকা থেকে তাকে পুলিশ গ্রেফতার
করে। এসময় তার কাছ থেকে পঞ্চাশ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। আটক ইউসুফ ওই এলাকার আব্দুস
সামাদ মিয়ার ছেলে। ২৫ ফেব্রুয়ারী ২০১৭ সাইনবোর্ড এলাকার ফ্যামিলি ল্যাব হাসপাতালে চাঁদাবাজি
ও ভাঙচুরের অভিযোগে ৭ ভুয়া সাংবাদিককে গ্রেফতার করে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা পুলিশ। গ্রেফতাররা
হলো, মো. শাহাদাৎ হোসেন ভূইয়া, নিশান, আব্দুস সাত্তার মোল্লা, মো. রাসেল, মোহাম্মদ
নুরুজ্জামান কাউসার, ফারুক আহমেদ, ফারুক হোসেন। এছাড়া পলাতক ছিল টিটু। এ প্রসঙ্গে ফতুল্লা
রিপোর্টার্স ক্লাবের সভাপতি রনজিৎ মোদক বলেন, শুধু পুলিশকে উদ্যোগ নিলেই হবে না, বিভিন্ন
সংবাদমাধ্যম এবং সাংবাদিক সংগঠনকে ভুয়া সাংবাদিক চিহ্নিত করতে ব্যবস্থা নিতে হবে৷নয়ত
সাংবাদিকদের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাবে আর পেশাদার সাংবাদিকরা বিব্রতকর অবস্থায়
পড়বেন। নারায়ণগঞ্জ জেলা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি শহিদুল্লাহ রাসেল বলেন, অপরাধীরা
তাদের অপরাধ ঢাকতে বিভিন্ন ভূঁইফোড় অনলাইন পত্রিকার আইডি কার্ড সংগ্রহ তাদের অপরাধ
ও তাদের স্বজনদের অপরাধ ঢাকার চেষ্টা করছে। অনেক ভুয়া কার্ডধারী সাংবাদিক গ্রেফতার
ও হচ্ছে। তবে যারা তাদের আইডি কার্ড দিয়েছে সেইসব সম্পাদকদেরও গ্রেফতার করতে হবে। তাহলেই
কিছুটা হলেও অপ-সাংবাদিকতা কমবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন